সকল লেখা
ব্লগ

মহানবি ﷺ-এর জন্মতারিখ: মতভেদের ইতিহাস, প্রমাণ ও আমাদের অবস্থান

Zobair Ahmad Tanim২৬ আগস্ট, ২০২৬ 14 মিনিট পড়া
মহানবি ﷺ-এর জন্মতারিখ: মতভেদের ইতিহাস, প্রমাণ ও আমাদের অবস্থান

মহানবি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্মতারিখ নিয়ে সীরাত ও ইতিহাসের গ্রন্থগুলোতে একাধিক মত পাওয়া যায়। কেউ বলেছেন ৮ রবিউল আউয়াল, কেউ ৯, কেউ ১০, আবার মত হিসেবে ১২ রবিউল আউয়ালের কথাও বলা হয়। এ ছাড়া আরো কিছু মত রয়েছে। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো—মহানবি ﷺ-এর জন্ম যে সোমবার হয়েছিল, তা সহিহ হাদিসে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত; কিন্তু রবিউল আউয়ালের কত তারিখে তাঁর জন্ম হয়েছিল, সে বিষয়ে কোনো হাদিসে নির্দিষ্ট তারিখ পাওয়া যায় না। ।

হজরত আবু কাতাদা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে সোমবারের রোজা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন—
فِيْهِ وُلِدْتُ، وَفِيْهِ أُنْزِلَ عَلَيَّ
অর্থাৎ “এ দিনেই আমি জন্মগ্রহণ করেছি এবং এ দিনেই আমার ওপর ওহি নাজিল হয়েছে।” [সহিহ মুসলিম, ১১৬২]

অতএব, সোমবার—এটি নিশ্চিত; কিন্তু তারিখ—এটি অনির্ধারিত। আর এই অনির্ধারিততার পেছনে একাধিক ঐতিহাসিক কারণ রয়েছে।

১. রাসুলুল্লাহ ﷺ নিজে জন্মতারিখ নির্দিষ্ট করে যাননি:
রাসুলুল্লাহ ﷺ তাঁর জন্মের দিন—সোমবারের কথা নিজেই জানিয়েছেন; কিন্তু মাসের কত তারিখে তাঁর জন্ম হয়েছিল, তা তিনি উল্লেখ করেননি। হাদিসে তাঁর সোমবারের রোজার কারণ জিজ্ঞেস করা হলে তিনি নিজের জন্মের দিন হিসেবে সোমবারের কথা বলেছেন; কিন্তু মাসের তারিখের কোনো উল্লেখ করেননি।

এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। কারণ, কোনো নির্দিষ্ট দিন যদি শরিয়তের কোনো বিধান, ইবাদত বা বার্ষিক ধর্মীয় অনুষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্কিত হতো, তাহলে তার তারিখ সংরক্ষণের প্রয়োজনও স্বাভাবিকভাবেই বেশি থাকত। কিন্তু জন্মতারিখকে কেন্দ্র করে রাসুলুল্লাহ ﷺ নিজে কোনো বার্ষিক ইবাদত বা উৎসব নির্ধারণ করে যাননি। ফলে তাঁর জন্মের বারটি সুস্পষ্টভাবে সংরক্ষিত হলেও নির্দিষ্ট তারিখটি একইভাবে সংরক্ষিত না হওয়া অস্বাভাবিক নয়।

২. সীরাতের পূর্ণাঙ্গ সংকলন পরবর্তী সময়ে সুসংবদ্ধ রূপ লাভ করে:
সাহাবায়ে কেরাম রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর জীবন, কথা, কাজ ও ঘটনাবলি জানতেন এবং পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তা বর্ণনাও করেছেন। কিন্তু আজ আমরা যে অর্থে স্বতন্ত্র ও পূর্ণাঙ্গ সীরাতশাস্ত্র বুঝি, তা পরবর্তী সময়ে সুসংবদ্ধ রূপ লাভ করে।

প্রথম যুগে মুসলিম উম্মাহর জ্ঞানচর্চার বড় অংশ ছিল কুরআন সংরক্ষণ, হাদিসের বর্ণনা ও যাচাই, ফিকহের বিধান সংরক্ষণ এবং দ্বীনের মৌলিক জ্ঞানকে পরবর্তী প্রজন্মে পৌঁছে দেওয়া। এরপর ধীরে ধীরে মাগাজি ও সীরাতের বর্ণনাগুলো পৃথকভাবে সংগৃহীত ও সংকলিত হয়।

ফলে এমন একটি তথ্য—যার ওপর কোনো শরিয়তি বিধান নির্ভরশীল ছিল না—তা প্রজন্মের পর প্রজন্ম একই নির্ভুলতার সঙ্গে সংরক্ষিত না হওয়া স্বাভাবিক। এ কারণেই পরবর্তী সীরাতকারদের কাছে বিভিন্ন বর্ণনা পৌঁছেছে এবং জন্মতারিখের ক্ষেত্রে একাধিক মত তৈরি হয়েছে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে সাহাবায়ে কেরাম বা প্রথম যুগের মুসলিমরা নবীজির জন্ম সম্পর্কে অজ্ঞ ছিলেন। বরং কথা হলো—নির্দিষ্ট তারিখটি সংরক্ষণ করার মতো কোনো শরিয়তি প্রয়োজন সৃষ্টি হয়নি।

৩. জাহেলি আরবের ‘নাসি’ প্রথা এবং মাসের সময়-ক্রমে পরিবর্তন
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জাহেলি আরবে নাসি (النَّسِيء) নামে একটি প্রথা প্রচলিত ছিল। পবিত্র মাসগুলোর সময় ও ক্রম নিয়ে এ ধরনের হস্তক্ষেপের কারণে মাসের প্রকৃত অবস্থান ও সময়কে কেন্দ্র করে পরিবর্তন ঘটত। এ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন—
اِنَّمَا النَّسِیۡٓءُ زِیَادَۃٌ فِی الۡكُفۡرِ یُضَلُّ بِهِ الَّذِیۡنَ كَفَرُوۡا یُحِلُّوۡنَهٗ عَامًا وَّ یُحَرِّمُوۡنَهٗ عَامًا لِّیُوَاطِـُٔوۡا عِدَّۃَ مَا حَرَّمَ اللّٰهُ فَیُحِلُّوۡا مَا حَرَّمَ اللّٰهُ ؕ زُیِّنَ لَهُمۡ سُوۡٓءُ اَعۡمَالِهِمۡ ؕ وَ اللّٰهُ لَا یَهۡدِی الۡقَوۡمَ الۡكٰفِرِیۡنَ
অর্থ: “এই নাসী (অর্থাৎ মাসকে পিছিয়ে নেওয়া) তো কুফরকেই বৃদ্ধি করা, যা দ্বারা কাফেরদেরকে বিভ্রান্ত করা হয়। তারা এ কাজকে এক বছর হালাল করে নেয় ও এক বছর হারাম সাব্যস্ত করে, যাতে আল্লাহ যে মাসকে নিষিদ্ধ করেছেন তার গণনা পূরণ করতে পারে এবং (এভাবে) আল্লাহ যা হারাম সাব্যস্ত করেছিলেন, তাকে হালাল করতে পারে। তাদের কুকর্মকে তাদের দৃষ্টিতে শোভনীয় করে দেওয়া হয়েছে। আর আল্লাহ এরূপ কাফেরদেরকে হিদায়াতপ্রাপ্ত করেন না।” [সূরা তাওবা, আয়াত: ৩৭]

সীরাত ও ইতিহাসের বর্ণনায় জাহেলি আরবের মাস-সংক্রান্ত এ ধরনের পরিবর্তন ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যবস্থার কথাও এসেছে। বিশেষত হজ ও ব্যবসায়িক স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সময়ের ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ করার প্রবণতা ছিল। এই বিষয়টি মহানবি ﷺ-এর জন্মতারিখসহ জাহেলি যুগের কোনো নির্দিষ্ট তারিখকে পরবর্তী কালের হিসাব দিয়ে নির্ণয়ের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তাই এটি আমাদের কাছে আরো স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

বিশুদ্ধ চন্দ্র ক্যালেন্ডারে মাসের গণনা চাঁদের আবর্তনের ভিত্তিতে হয়। ফলে চন্দ্র মাসগুলো বছরের নির্দিষ্ট কোনো ঋতুর সঙ্গে স্থায়ীভাবে বাঁধা থাকে না; একটি মাস ধীরে ধীরে শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ ও বসন্ত—বিভিন্ন ঋতুর মধ্য দিয়ে অতিক্রম করে। অন্যদিকে সৌর ক্যালেন্ডারের মাসগুলো ঋতুর সঙ্গে প্রায় স্থির সম্পর্ক বজায় রাখে—জানুয়ারি শীতের সময়, মার্চ বসন্তের সময়, জুন গ্রীষ্মের সময় এবং অক্টোবর শরতের সময়ের সঙ্গে আসে।

চন্দ্র বছর সৌর বছরের তুলনায় প্রায় ১১ দিন ছোট। তাই চন্দ্র মাসগুলোকে যদি সৌর বছরের ঋতুগুলোর সঙ্গে কৃত্রিমভাবে একই অবস্থানে ধরে রাখতে হয়, তবে কোনো কোনো চন্দ্র বছরে অতিরিক্ত একটি মাস যোগ করতে হয়। এভাবেই বিশুদ্ধ চন্দ্র গণনায় রদবদল ঘটিয়ে তাকে সৌর গণনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার ব্যবস্থা করা সম্ভব। কিন্তু যখন অতিরিক্ত মাস যোগ করা হয়, তখন চন্দ্র মাসগুলো তাদের স্বাভাবিক ধারাবাহিক অবস্থান থেকে সরে যায়।

মুশরিকরা হিজরতের প্রায় ২২০ বছর পূর্বে বিশুদ্ধ চন্দ্র ক্যালেন্ডারে এ ধরনের বিকৃতি সাধন করেছিল। এর পেছনে ধর্মীয় প্রয়োজনের চেয়ে ব্যবসায়িক স্বার্থ বড় ভূমিকা রেখেছিল বলে ঐতিহাসিক নানা সূত্রে এসেছে। কারণ, হজ ছিল তাদের জন্য একটি বড় বাণিজ্যিক মৌসুম; হজের সময়কে ঘিরে বিভিন্ন বাণিজ্যিক মেলা বসত। কিন্তু বিশুদ্ধ চন্দ্র গণনায় হজ কখনো গ্রীষ্মে, কখনো শীতে এসে পড়ত। এতে খেজুর, ভেড়া-ছাগল ও অন্যান্য বাণিজ্যিক কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারত।

এই বাণিজ্যিক স্বার্থের কারণে হজকে একটি সুবিধাজনক ঋতুর মধ্যে রাখার চেষ্টা করা হয়। ইতিহাসে এসেছে, বনু কিনানাহর সরদারগণ ‘নাসি’ (النَّسِيء)—অর্থাৎ অধিমাস যোগ করে ক্যালেন্ডার সংশোধনের—পদ্ধতি কার্যকর করেন। এর ফলে চন্দ্র মাসগুলোকে কৃত্রিমভাবে সৌর মাসের ঋতুচক্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে দেওয়া হতো। বর্ণিত ব্যবস্থায় জিলহজ প্রতি বছর সেপ্টেম্বরের শেষ বা অক্টোবরের শুরুতে আসতে শুরু করে; রমজান জুনে এবং হজ গ্রীষ্মের শেষভাগে, আগস্টের দিকে অনুষ্ঠিত হওয়ার ধারাও তৈরি হয়।

এ ব্যবস্থায় প্রয়োজন অনুযায়ী কোনো কোনো বছরে ১৩তম মাসও যোগ করা হতো। বনু কিনানাহর সরদার হজের অনুষ্ঠানে ঘোষণা করত—পরবর্তী বছর ১২ মাসের পর ১৩তম মাস হবে এবং অতিরিক্ত মাসটি কোন মাসের সঙ্গে যুক্ত হবে—সেটাও জানাত। এভাবে ক্যালেন্ডারের স্বাভাবিক চন্দ্রক্রমকে এগিয়ে-পিছিয়ে দেওয়ার কাজটি করত নিজেদের ইচ্ছামতো ।

সম্ভবত কিছু চন্দ্র মাসের নামের সঙ্গেও ঋতুভিত্তিক এই পুরোনো অভিজ্ঞতার সম্পর্ক ছিল। যেমন—জুমাদাল উলা ও জুমাদাল উখরা নামের ‘জুমাদ’ ধাতু জমে যাওয়া বা শীতলতার অর্থ বহন করে; আর ‘রমজান’ শব্দটি ‘রমজ’—তীব্র গরম—ধাতু থেকে উদ্ভূত বলে ব্যাখ্যা করা হয়। তবে পরবর্তী সময়ে বিশুদ্ধ চন্দ্র গণনা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কারণে এই মাসগুলো আর প্রতি বছর একই ঋতুতে অবস্থান করে না।

যাইহোক, নাসি (النَّسِيء) শুধু হজের সময় পরিবর্তনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; সম্মানিত চার মাসের ব্যবস্থাতেও এর প্রভাব পড়েছিল। আরবরা রজব, জিলকদ, জিলহজ ও মহররম—এই চার ‘আশহুরে হুরুম’ তথা সম্মানিত চার মাসের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিল। কিন্তু হজের মাসকে কৃত্রিমভাবে সরিয়ে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সম্মানিত মাসগুলোর সময়ও তাদের মূল অবস্থান থেকে সরিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন দেখা দিত। ফলে হজের অনুষ্ঠানে পরবর্তী বছরের কোন কোন মাস ‘আশহুরে হুরুম’ হবে, তাও ঘোষণা করা হতো।

অতএব ‘নাসি’ (النَّسِيء)-এর মধ্যে অন্তত দুটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন জড়িত ছিল: (১) হজের সময়সূচিতে পরিবর্তন এবং (২) সম্মানিত মাসগুলোর দিনক্ষণ ও অবস্থানে পরিবর্তন। ফলে মক্কা ও তার আশপাশে প্রচলিত সময়-গণনা আর নিখাদ চন্দ্র গণনা থাকেনি; বরং তা চন্দ্র ও সৌর গণনার এক কৃত্রিম সমন্বিত ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছিল।

অন্যদিকে মদিনা ও তার আশপাশে বসবাসকারী আরব গোত্রগুলোর মধ্যে বিশুদ্ধ চন্দ্র গণনা কিছুটা বজায় ছিল। এ কারণে একই সময়ে আরবদের মধ্যে “চন্দ্র-সৌর ক্যালেন্ডার” তথা মক্কী ক্যালেন্ডার এবং “খাঁটি চন্দ্র ক্যালেন্ডার” তথা মাদানী ক্যালেন্ডার—এ দুই ধরনের গণনা প্রচলিত ছিল বলে ঐতিহাসিক বর্ণনায় এসেছে। এর পাশাপাশি একটি ‘চন্দ্র-সৌর রবিয়ি’ ক্যালেন্ডারের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে, যা বসন্তকালে শুরু হতো; তবে এর ব্যবহার সম্ভবত সীমিত ছিল।

চন্দ্র-সৌর ক্যালেন্ডারটি ৩৩ বছর পর একটি পূর্ণ চক্র সম্পন্ন করে আবার খাঁটি চন্দ্র ক্যালেন্ডারের সঙ্গে সমতা লাভ করত। কিন্তু এই দীর্ঘ ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে একটি পূর্ণ চন্দ্র বছর হিসাবের বাইরে চলে যেত। ফলে নাসি (النَّسِيء) প্রথা বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত জাহেলি আরবের তারিখগুলোকে আজকের বিশুদ্ধ হিজরি গণনার সঙ্গে সরাসরি মিলিয়ে নেওয়া জটিল হয়ে পড়ে।

বিদায় হজের সময় রাসুলুল্লাহ ﷺ নাসি (النَّسِيء) প্রথার অবসান ঘোষণা করেন এবং সময়কে তার মূল অবস্থায় ফিরিয়ে দেন। তিনি বলেন—
إِنَّ الزَّمَانَ قَدِ اسْتَدَارَ كَهَيْئَتِهِ يَوْمَ خَلَقَ اللهُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ، السَّنَةُ اثْنَا عَشَرَ شَهْرًا، مِنْهَا أَرْبَعَةٌ حُرُمٌ، ثَلَاثٌ مُتَوَالِيَاتٌ: ذُو الْقَعْدَةِ، وَذُو الْحِجَّةِ، وَالْمُحَرَّمُ، وَرَجَبُ مُضَرَ الَّذِي بَيْنَ جُمَادَى وَشَعْبَانَ.
অর্থ: “নিশ্চয়ই সময় তার সেই মূল অবস্থায় ফিরে এসেছে, যে অবস্থায় আল্লাহ আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছিলেন। বছর বারো মাসের; এর মধ্যে চারটি সম্মানিত মাস।” [সহিহ বুখারি, হাদিস নং: ৪৬৬২; সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ১৬৭৯; মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং: ২০৩৮৬; সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস নং: ৫৯৭৪]

এর পর থেকে আরবদের মধ্যে বিশুদ্ধ চন্দ্র ক্যালেন্ডারই পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হয়। ফলে আজকের হিজরি ক্যালেন্ডার একটি বিশুদ্ধ চন্দ্রভিত্তিক গণনা—যেখানে কোনো মাসকে স্থায়ীভাবে কোনো সৌর ঋতুর সঙ্গে আটকে রাখা হয় না।

এই ঐতিহাসিক পটভূমি মহানবি ﷺ-এর জন্মতারিখের মতভেদের আলোচনায় বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, নাসি (النَّسِيء) প্রথা চালু থাকা সময়ে সীরাতের কোনো ঘটনা মক্কী চন্দ্র-সৌর গণনা অনুযায়ী বর্ণিত হয়েছে কি না, অথবা খাঁটি চন্দ্র গণনা অনুযায়ী হয়েছে কি না—তা সবসময় স্পষ্ট নয়। ফলে পরবর্তী যুগের গবেষকরা যখন প্রাচীন বর্ণনাগুলোকে আধুনিক বা পরবর্তী হিজরি গণনার সঙ্গে মিলিয়ে নির্দিষ্ট তারিখ বের করতে চান, তখন হিসাবের মধ্যে জটিলতা তৈরি হতে পারে।

অতএব, মহানবি ﷺ-এর জন্ম রবিউল আউয়ালের কোন তারিখে হয়েছিল—এই প্রশ্নে শুধু বর্ণনার শব্দগত পার্থক্য নয়; জাহেলি আরবের নাসি (النَّسِيء) প্রথা, মক্কা-মদিনা অঞ্চলের সময়-গণনার পার্থক্য এবং পরবর্তী কালের ক্যালেন্ডার-রূপান্তর—এসব ঐতিহাসিক বিষয়ও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। এ কারণেই একটি নির্দিষ্ট তারিখকে ‘শতভাগ নিশ্চিত’ বলে উপস্থাপন করার ক্ষেত্রে সতর্কতা অপরিহার্য। [তারিখে উম্মতে মুসলিমা, ইসমাইল রেহান: ১/৩৮-৪০]

৪. জন্মের সময় কেউ জানত না—তিনি বিশ্বনবি হবেন:
আরেকটি বিষয়ও বিবেচনা করা দরকার। মহানবি ﷺ-এর জন্মের সময় তাঁর চারপাশের মানুষ তো জানতই না যে, এই শিশু ভবিষ্যতে সমগ্র মানবজাতির জন্য আল্লাহর রাসুল হবেন। অতএব, জন্মের সময় তাঁর নির্দিষ্ট তারিখ বিশেষভাবে সংরক্ষণ করার প্রয়োজন মানুষ অনুভব করবে—এমনটি প্রত্যাশা করা কঠিন।

নবুয়ত লাভের পর অবশ্য তাঁর মর্যাদা ও পরিচয় স্পষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু তখন মুসলিমদের প্রধান মনোযোগ ছিল ঈমান, তাওহিদ, সালাত, দাওয়াত, আখলাক, পারিবারিক জীবন, সামাজিক সংস্কার, জিহাদ, হালাল-হারাম এবং শরিয়তের অন্যান্য বিধানের দিকে। জন্মতারিখকে কেন্দ্র করে কোনো বার্ষিক ধর্মীয় অনুষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করার বিষয়টি তাঁর শিক্ষা ও কর্মপদ্ধতিতে পাওয়া যায় না।

তাহলে জন্মতারিখ কোনটি?

সীরাত ও ইতিহাসের বিভিন্ন গ্রন্থে ৮, ৯, ১০ ও ১২ রবিউল আউয়ালসহ বিভিন্ন মত পাওয়া যায়। ১২ রবিউল আউয়াল একটি প্রসিদ্ধ মত হলেও এটিকে নিশ্চিত ও অকাট্য প্রমাণিত তারিখ বলা যায় না।

অন্যদিকে ৯ রবিউল আউয়ালকে কিছু সীরাত-গবেষক ঐতিহাসিক বর্ণনা ও জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক হিসাবের আলোকে অধিক সম্ভাবনাময় মনে করেছেন। তাই ভারসাম্যপূর্ণ বক্তব্য হলো—মহানবী ﷺ-এর জন্ম সোমবার—এটি সহিহ হাদিসে প্রমাণিত। কিন্তু রবিউল আউয়ালের কোন তারিখে তাঁর জন্ম হয়েছিল, তা নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত নয়। বিভিন্ন মতের মধ্যে ৯ রবিউল আউয়ালকে অধিক সম্ভাবনাময় মনে করা হলেও এটিকে চূড়ান্ত ও অকাট্য সিদ্ধান্ত হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক নয়।

সেই সঙ্গে আসল বিষয় জন্মতারিখ নয়—বরং নববি আদর্শ। এখানেই আলোচনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক।

মহানবি ﷺ-এর জন্মতারিখ নিয়ে গবেষণা করা যেতে পারে। কোন বর্ণনা কতটা শক্তিশালী, কোন ঐতিহাসিক তথ্য কোন মতকে সমর্থন করে—এসব নিয়ে আলোচনা করাও প্রয়োজনীয়। কিন্তু একজন মুসলমানের জন্য আরও বড় প্রশ্ন হলো—আমরা কি তাঁর জীবন ও আদর্শ অনুসরণ করছি?

আল্লাহ তাআলা বলেন—
لَقَدۡ كَانَ لَكُمۡ فِیۡ رَسُوۡلِ اللّٰهِ اُسۡوَۃٌ حَسَنَۃٌ لِّمَنۡ كَانَ یَرۡجُوا اللّٰهَ وَ الۡیَوۡمَ الۡاٰخِرَ وَ ذَكَرَ اللّٰهَ كَثِیۡرًا
অর্থ: “নিশ্চয় আল্লাহর রাসুলের মধ্যে তোমাদের জন্য রয়েছে উত্তম আদর্শ—এমন ব্যক্তির জন্য, যে আল্লাহ ও আখেরাত দিবসের আশা রাখে এবং আল্লাহকে অধিক পরিমাণে স্মরণ করে।” [সূরা আহযাব, আয়াত: ২১]

আরো বলেন—
قُلۡ اِنۡ كُنۡتُمۡ تُحِبُّوۡنَ اللّٰهَ فَاتَّبِعُوۡنِیۡ یُحۡبِبۡكُمُ اللّٰهُ وَ یَغۡفِرۡ لَكُمۡ ذُنُوۡبَكُمۡ ؕ وَ اللّٰهُ غَفُوۡرٌ رَّحِیۡمٌ
অর্থ: “(হে নবী! আপনি মানুষকে) বলে দিন, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবেসে থাক, তবে আমার অনুসরণ কর, তাহলে আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের পাপগুলোকে ক্ষমা করবেন। আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ৩১]

অর্থাৎ ভালোবাসার প্রকৃত প্রমাণ কেবল আবেগ নয়; ভালোবাসার প্রকৃত প্রমাণ হলো অনুসরণ। এ ক্ষেত্রে আবু লাহাবের একটি শিক্ষণীয় ঘটনা উল্লেখ করা যায়।

বিশ্বনবি ﷺ-এর চাচা আবু লাহাবের কাছে যখন ভাতিজা-জন্মের সুসংবাদ এলো, তখন সুসংবাদ বহনকারিণী সুয়াইবা রাদিয়াল্লাহু আনহা-কে, যিনি তখন দাসী ছিলেন, তাৎক্ষণিক আজাদ করে দেন। আর বলেন, এমন খুশির সংবাদ যে বহন করবে, তার সাথে দাসত্ব যায় না। তোমার এ আজাদী আমার এতিম ভাতিজার সম্মানে।

ঘটনাটি সম্পর্কে উরওয়া ইবনে যুবাইর (রহ.)-এর বর্ণনায় এসেছে, আবু লাহাবের দাসী সুয়াইবা রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে দুধ পান করিয়েছিলেন এবং আবু লাহাব তাঁকে মুক্ত করে দিয়েছিল। এরপর আবু লাহাবের মৃত্যুর পর তার পরিবারের একজন সদস্য তাকে স্বপ্নে দেখতে পায় এবং তার অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। আবু লাহাব জানায়, সে সামান্য উপকার পেয়েছে এবং তা সুয়াইবাকে মুক্ত করার কারণে। [সহিহ বুখারি, হাদিস নং: ৫১০১]

তবে ঘটনাটির সবচেয়ে বড় শিক্ষাটি অন্য জায়গায়। আবু লাহাব তার ভাতিজা মুহাম্মদ ﷺ-এর জন্মের সংবাদে আনন্দ প্রকাশ করেছিল। কিন্তু যখন সেই ভাতিজাই আল্লাহর রাসুল হয়ে তাওহিদ ও ঈমানের দাওয়াত নিয়ে দাঁড়ালেন, তখন আবু লাহাব তাঁর ঘোর বিরোধী হয়ে গেল। আল্লাহ তাআলা তার ব্যাপারে ঘোষণা করলেন—
تَبَّتۡ یَدَاۤ اَبِیۡ لَهَبٍ وَّ تَبَّ
অর্থ: “আবু লাহাবের দুই হাত ধ্বংস হোক এবং সে নিজে ধ্বংস হয়েই গেছে।” [সূরা লাহাব, আয়াত: ১]

এখানেই গভীর একটি শিক্ষা রয়েছে—শুধু নবীজির ﷺ জন্মে আনন্দ প্রকাশ করাই ভালোবাসার পূর্ণ প্রমাণ নয়; তাঁর আনীত দ্বীন গ্রহণ করা, তাঁর আদর্শ অনুসরণ করা এবং তাঁর সুন্নাহ অনুযায়ী জীবন গঠন করাই ভালোবাসার প্রকৃত দাবি।

ভালোবাসার নামে নতুন কিছু সংযোজন নয়; রাসুলুল্লাহ ﷺ সতর্ক করে বলেছেন—
مَنْ أَحْدَثَ فِي أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ مِنْهُ فَهُوَ رَدٌّ
অর্থ: “যে ব্যক্তি আমাদের এই দ্বীনের মধ্যে এমন কিছু নতুন প্রবর্তন করবে, যা এর অন্তর্ভুক্ত নয়, তা প্রত্যাখ্যাত।” [সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ১৭১৮; সহিহ বুখারি, হাদিস নং: ২৬৯৭]

সুতরাং দ্বীনের ক্ষেত্রে ভালো উদ্দেশ্য থাকলেই নতুন কোনো পদ্ধতি শরিয়তসম্মত হয়ে যায় না। ইবাদত ও ধর্মীয় উৎসবের ক্ষেত্রে ভালোবাসার পাশাপাশি সুন্নাহর অনুসরণও অপরিহার্য।

ঈদ কতটি?
আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ মদিনায় এসে দেখলেন, সেখানকার লোকদের দু’টি আনন্দের দিন ছিল। তিনি জানতে চাইলেন, এ দুটি দিন কী? তারা জানাল, জাহেলি যুগে তারা এ দুদিন খেলাধুলা করত। তখন রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন—
إِنَّ اللهَ قَدْ أَبْدَلَكُمْ بِهِمَا خَيْرًا مِنْهُمَا يَوْمَ الأَضْحَى وَيَوْمَ الْفِطْرِ
অর্থ: “আল্লাহ তোমাদের এ দুটির পরিবর্তে এর চেয়ে উত্তম দু’টি দিন দিয়েছেন: ঈদুল আজহা ও ঈদুল ফিতর।” [সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং: ১১৩৪; সুনানে নাসায়ি, হাদিস নং: ১৫৫৬; মুসনাদের আহমাদ, হাদিস নং: ১২০০৬]

অতএব, মুসলমানদের জন্য ধর্মীয় ঈদ ও বার্ষিক উৎসব নির্ধারণ কোনো ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয় নয়। রাসুলুল্লাহ ﷺ যে বিধান দিয়েছেন, সেটিই আমাদের জন্য যথেষ্ট।

তাই মহানবী ﷺ-এর জন্মতারিখ নিয়ে গবেষণা হোক। ৮, ৯, ১০, ১২—প্রতিটি মতের দলিল ও ঐতিহাসিক ভিত্তি যাচাই করা হোক। কোন মত অধিক শক্তিশালী, কোন বর্ণনা কতটা নির্ভরযোগ্য—এসব নিয়ে একাডেমিক আলোচনা হোক। কিন্তু একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে— যে তারিখটি রাসুলুল্লাহ ﷺ নিজে নির্দিষ্ট করে যাননি, সাহাবায়ে কেরাম সেটিকে বার্ষিক ধর্মীয় উৎসব হিসেবে পালন করেননি, তাবেয়িন ও তাবে-তাবেয়িন তা করেননি এবং প্রাথমিক যুগের ইমামগণও এভাবে পালন করেননি—সেই তারিখকে পরবর্তীতে শরিয়ত নির্ধারিত ধর্মীয় উৎসবের মর্যাদা দেওয়ার ব্যাপারে সতর্ক থাকা জরুরি। কারণ ভালোবাসার সর্বোচ্চ প্রকাশ নতুন কিছু যোগ করা নয়; বরং নবীজি ﷺ যা এনেছেন, সেটিকে আঁকড়ে ধরা।

আমাদের প্রশ্ন তাই শুধু—“নবীজি ﷺ কবে জন্মগ্রহণ করেছিলেন?”—এতটুকুতে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। বরং এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হওয়া উচিত—“নবীজি ﷺ কীভাবে জীবনযাপন করেছিলেন, কীভাবে তাঁর জীবনকে পরিচালিত করেছিলেন এবং কীভাবে আমাদের জন্য একটি আদর্শ জীবন রেখে গেছেন?”

জন্মতারিখ জানা ভালো; কিন্তু নববী চরিত্র ধারণ করা আরও জরুরি।
সীরাত জানা ভালো; কিন্তু সীরাত অনুযায়ী জীবন গড়া আরও জরুরি।
নবীজির প্রতি ভালোবাসার দাবি করা ভালো; কিন্তু তাঁর সুন্নাহর সামনে নিজের প্রবৃত্তিকে সমর্পণ করা তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ।

সুতরাং নবীজির জন্মকে কেন্দ্র করে আবেগের অতিরঞ্জনের পরিবর্তে আমাদের জীবনে তাঁর সুন্নাহ, আখলাক, ইবাদত, দাওয়াত, ন্যায়নীতি ও মানবিক আদর্শ বাস্তবায়নই হোক ভালোবাসার প্রকৃত পরিচয়।

বিশ্বনবি ﷺ-এর জন্ম আমাদের জন্য অবশ্যই মহান নিয়ামত; কিন্তু তাঁর আগমন যে হিদায়াত, সুন্নাহ ও আদর্শ নিয়ে এসেছিল, সেই হিদায়াতকে নিজের জীবনে ধারণ করাই আমাদের প্রকৃত সফলতা।

اللَّهُمَّ ارْزُقْنَا حُبَّ نَبِيِّكَ ﷺ وَاتِّبَاعَ سُنَّتِهِ وَالِاقْتِدَاءَ بِهِ فِي أَقْوَالِنَا وَأَعْمَالِنَا.
হে আল্লাহ! আমাদেরকে আপনার নবীজি ﷺ-এর ভালোবাসা, তাঁর সুন্নাহর অনুসরণ এবং কথা ও কাজে তাঁর আদর্শ গ্রহণের তাওফিক দান করুন। আমিন।

তারবিয়াহ একাডেমি নিউজলেটার

সপ্তাহে একটি অর্থবহ ইমেইল — কোনো অপ্রয়োজনীয় কথা নয়।

নতুন কোর্সের ঘোষণা, ইলমি লেখা ও বরকতময় রিমাইন্ডার — সরাসরি আপনার ইনবক্সে।